Description
চলচ্চিত্র–বিশেষজ্ঞ হিসেবে শিলাদিত্য সেনের নামটা পাঠকদের কাছে অনেক দিনই পরিচিত। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিকতম বইটির শিরোনামে কোথায় যেন একটা রাশিবিজ্ঞানের গন্ধ রয়েছে। ‘সংখ্যাধিক’, ‘খতিয়ান’ এ–সব তো অর্থনীতির ভাষা! লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের অঙ্গনে ‘তুমহারা কেয়া কাম হ্যায়’? বইয়ের শুরুতে তাঁর আত্মপক্ষে এ প্রশ্নের কোনও সরাসরি উত্তর দেননি শিলাদিত্য। শুধু বলেছেন, গত কুড়ি–পঁচিশ বছরে মূলধারার ছবিতে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট’, তার ‘আধিপত্যকামীতা’কে যেভাবে বৈধতা বা মান্যতা দেওয়া হয়েছে এবং পরিবার–দেশপ্রেম–নৈতিকতা–মানবতা এ সব নানারকম ছদ্মবেশের আড়ালে, সেগুলোকে যতদূর সম্ভব আড়ালে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। সেগুলোকেই তিনি এখানে খুঁজে ও খুঁড়ে বের করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
সত্যি বলতে–কি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিনয় ও নম্রতায় শিলাদিত্য ঠিক এতটাও বলেননি। কিন্তু পুরো বইটা পড়ে ওঠার পরে মনে হবে তিনি কোথাও একটা সামাজিক অডিট–এর কাজেই নেমেছেন। সেখানে পাতায় পাতায় পরিসংখ্যান, সারণি, সূচক— এ সব হয়ত নেই— গণশুনানির জন্য জন–সমাবেশ নেই কিন্তু বিনোদনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের পেশি–আস্ফালন আর আগ্রাসী কুচকাওয়াজের তলায় কোথায় কীভাবে চাপা পড়ে থাকে প্রান্তিক–সংখ্যালঘু স্বর, মোটামুটি ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ অবধি হলিউড ও বলিউড মন্থন করে সেই বিষাক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে এনেছেন শিলাদিত্য। এই বইয়ের প্রবন্ধগুলির রচনাকাল মোটামুটি মধ্য–নব্বই থেকে শুরু। ততদিনে সোবিয়েত ইউনিয়ন তথা পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে গেছে। ফলে হলিউড ছবির এককালের একচেটিয়া কমিউনিস্ট ভিলেন–কোম্পানির আর সেভাবে প্রাসঙ্গিকতা থাকছে না। কিন্তু এক মেরু সেই বিশ্ব ‘জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না’? জেমস বন্ডের ছবি ‘ডাই অ্যানাদার ডে’র আলোচনায় শিলাদিত্য দেখিয়েছেন সমাজতন্ত্রের এতটুকুও নাম–গন্ধ লেগে আছে যে সব দেশের সঙ্গে সেই চীন–কিউবা–উত্তর কোরিয়াই এখন দীন–দুনিয়ার উদ্ধারকর্তা বন্ডের নয়া ভিলেন। আর পিয়ের্স ব্রসনন অভিনীত বন্ড যেন এই নতুন শতাব্দীর নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদের প্রতিনিধি নতুন কলম্বাস।
তাঁর বইয়ের প্রথম অংশ ‘হলিউড, আমেরিকার অভিভাবকত্ব’ পর্বের বিভিন্ন প্রবন্ধে শিলাদিত্য এটাই দেখাতে চেয়েছেন, আমেরিকার দুনিয়া–ভর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের সঙ্গে হলিউডের পুঁজি–বিনিয়োগ কীভাবে গাঁটছড়া বেঁধে থাকে। রেগন–বুশ–ট্রাম্প আদি মার্কিনি রাষ্ট্রনেতারা বুক বাজিয়ে যেটা বলেন, হলিউডের সিনেমা সেটাকেই পর্দায় প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে আমেরিকা সবসময়ই পৃথিবীর নৈতিক অভিভাবক। গণতন্ত্রের একমেবা–দ্বিতীয়ম্ ত্রাতা। এমনকী তার যে–কোনও যুদ্ধ–প্রকল্পও আসলে ন্যায় ও মানবতার পক্ষেই!
বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব ‘বলিউড: গরিষ্ঠের হিন্দুত্ব’র প্রবন্ধগুলি আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন সময়ে লেখা হলেও সবটা মিলিয়ে হয়তো একটাই লেখা হয়ে উঠেছে। সেখানে ভাঁজে ভাঁজে, পরতে–পরতে খুলে দেখানো হয়েছে, নব্বইয়ের দশক থেকে কীভাবে ধারাবাহিকভাবে বলিউডের বিভিন্ন সিনেমার ন্যারেটিভে রাষ্ট্র ও পরিবার ও হিন্দুত্ববাদকে একাকার করে ফেলা হয়েছে। শিলাদিত্যের সঙ্গে পাঠক তর্কে নামতেই পারেন। হলিউডের মতো বলিউডের ছবিতে রাজনৈতিক মতাদর্শ অত কিছু গুরুত্ব পায় না। কিন্তু আমরা যখন দেখছি, সাধারণ নির্বাচনকে দোরগোড়ায় রেখে একই সপ্তাহে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও ইউপিও জমানার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দু–দুটো ছবি মুক্তি পাচ্ছে— এবং সে–দুটো ছবির পক্ষে প্রচারের ব্যাপারটা বিজেপি–র রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ঢুকে পড়ছে, তখন কিন্তু শিলাদিত্যের বইটা আগে একবার মন দিয়ে ফিরে পড়তে হবে!






Reviews
There are no reviews yet.