Description
আত্রেয়ী তীরবর্তী ছাটমোহর গ্রামের মধ্য দিয়ে এক দীর্ঘকায় গৌরবর্ণ বলশালী ব্রাহ্মণ চলেছেন। তাঁর পরিষ্কার মুখমণ্ডলে উজ্জ্বল দুটি চক্ষু। সাথে তাঁর দুই অল্প বয়সী সঙ্গী। তাঁদের গন্তব্য চলনবিলের তীর। দুপাশে বনানীর মাঝে সরু মেঠো পথ। শাল, দেবদারু, দারুচিনি, আম, কাঁঠাল গাছে ঘেরা গ্রামে পুস্পতরুর শোভাও লোভনীয়। সব রকমের গাছে বিভিন্ন রঙের ফুল ফুটে আছে। গোলাপ, টগর, ধুতরা, জবা, গাঁদা ফুলের সারির মাঝে কাল রাতের ফোটা রজনীগন্ধার গন্ধে চারদিক ম ম করছে। শ্রাবণ মাসের কড়া রোদে তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ ক্লান্ত। দিন দুই বৃষ্টির দেখা নেই, যদিও সকালে খানিক কালো মেঘের দেখা মিলেছিল, কিন্তু পরিযায়ী পাখীদের মতন সেই মেঘ কোন যক্ষীর বার্তা নিয়ে বিন্ধ্যপর্বতের দিকে মিলিয়ে গেছিল। মেঘের ভীতি প্রদর্শনে আহত হয়ে সূর্যদেবের ভ্রূকুটি বাংলাবাসীর উপর আজ যেন অতিরিক্ত ক্লেশ সঞ্চার করছে। তাই তাঁরা পথের মাঝে বিশাল বটবৃক্ষের তলায় দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিতে চাইল। ব্রাহ্মণের তেমন কোন ক্লান্তি নেই। কিন্তু তাঁর সাথের সদ্য যুবকেরা রীতিমত ভেঙে পড়েছে। ব্রাহ্মণ তাঁর এক সঙ্গীকে বললেন, মোহনরাম, ইধার ঠেহরো। ম্যায় যাকে কুছ খানা জুগার করতা হুঁ।
অপর সঙ্গী বললেন, গুরুদেব। হাম রহেতে আপ কাহাঁ যায়েঙ্গে। মুঝে আজ্ঞা কিজিয়ে।
মোহনরাম নামক ছোকরা ক্লান্তিতে শুয়ে পড়েছে। তার পক্ষে এই কথোপকথনে অংশগ্রহন করা সম্ভব ছিল না। গুরুদেবের আজ্ঞায় অপর সঙ্গীটি নিকটবর্তী পুকুর থেকে গায়ের চাদর ভিজিয়ে চট জলদি সামান্য জল এনে সঙ্গীটি মোহনরামের মুখে ছিটিয়ে দিলেন। এমন সময় গাঁয়ের এক বৃদ্ধ ও তাঁর পুত্র ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের হাতে ক্ষৌরকর্মের সরঞ্জাম। বিদেশী তিন মানুষকে দেখে তাঁরা খানিক দাঁড়ালেন। গ্রামে এখন জোর গুজব মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির ব্যাপারে। সাহেবরা নাকি জায়গায় জায়গায় তাদের লোক পাঠিয়ে সরজমিনে তদন্ত করছে। দেশের সকল রাজা রানীকে মেরে নিজেরাই নাকি রাজা হওয়ার মতলব ভাঁজছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই ব্রাহ্মণগুরুদেব ও তাঁর সঙ্গীদের ওরা সন্দেহের নজরে দেখল। ছোকরাটি সাহস করে স্বভাষায় প্রশ্ন করল, আপনেরা কুথা থাইক্যা আসতাছেন?
পথ মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপঞ্জী বুদ্ধিমান ব্রাহ্মণের কর্ণগোচর হয়েছিল। এ ভাষায় যদিও সে ভাবে বিশেষ পারদর্শী নয় তবুও মাতৃভাষা তো বটেই। বুকে একরাশ সাহস নিয়ে বললেন, আসতাছি সেই সুদূর কাশী থিক্যা। বাপের লগে শুনছিলাম এই গেরামেই আমাগো পুরানো আস্তানা আছিল। শুনছি আমাগো মহারাজা রামকান্ত বড় ভাল মানুষ, তাই তাঁর লগে আশীর্বাদ লইতে যাইতাছি।
খানিক কথোপকথনে বৃদ্ধ ও তাঁর পুত্র বুঝতে পারল এ ব্রাহ্মণ যে সে মানুষ নন। তড়িঘড়ি তারা গ্রামে খবর দিল। এবং দেখতে দেখতে রানীমার কাছে খবর পৌছাল যে এক মস্ত পণ্ডিত ব্রাহ্মণ সুদূর কাশী থেকে বাংলায় রানীর রাজত্বে পদার্পণ করেছেন। রানী ভবানী তখন স্পষ্টতই একাকী। রাজা রামকান্ত মারা গেছেন কয়েকমাস হল। এই অবস্থায় সদ্য বিধবা নিজে হাতে জমিদারির দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। প্রজাদের কাছে রানীমা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা হলেও অমাত্যরা ভাল চোখে দেখছেন না। তাঁরা কেউ চান না কোন মহিলার পদাধীন থাকতে।






Reviews
There are no reviews yet.