Description
আবিসিনিয়ার পূর্বমধ্য ঘন বনাঞ্চলে এক উপজাতি পরিবারে জন্ম হয় এক কৃষ্ণবর্ণের শিশুর। ভাগ্যের পরিহাসেই সে কৈশোর বয়সেই নিজের পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। আবিসিনিয়ার আরও অনেক ওরোমো উপজাতির শিশু-কিশোরের মতোই দাস হিসাবে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় আফ্রিকার বন্দর নগরী জেইলাতে। জেইলা থেকে দামাস্কাস হয়ে হাত বদল হতে হতে সে এসে কিছুদিনের জন্য থিতু হয় বাগদাদে। বাগদাদ থেকে হাত বদল হয়ে প্রাক-যৌবনে সে এসে পৌঁছালো ভারতের আহমেদনগর রাজ্যে।
ভারতের উত্তরে তখন সবে মোগলরা পদার্পণ করেছে আর দক্ষিণে বাহমণি সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে সদ্যজাত পাঁচটি পরস্পর বিরোধী সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছে- আহমেদনগর, গোলকুন্ডা, বিজাপুর, বেরার ও বিদর। এই পাঁচ পরস্পর বিরোধী রাজ্যের শাসকরা কোনও দিনই সেই অর্থে সক্ষম শাসক ছিলেন না। এই সব রাজ্যের রক্ষকরাই রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা নিতেন আবার এই রক্ষকরাই মাঝে মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা করে মসনদ দখলের চেষ্টা করতেন। রাজ্যের এই অরাজক পরিস্থিতিতে রাজ্যের রানীরা অন্তরমহলের পর্দা সরিয়ে রাজনীতি থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ করতেন। বিজাপুরের রাজমাতা বুবুজি খানুম দক্ষহাতে বিশ্বাসঘাতকদের দমন করেছিলেন। আবার আমহেদনগরের রাজকন্যা তথা বিজাপুরের রানী চাঁদবিবি তাঁর স্বামী প্রথম আলি আদিল শাহের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করতেন। রাজনীতি ও যুদ্ধনীতিতে অসাধারণ এই মহিলা বিজাপুর ও আহমেদনগর এই দুই রাজ্যের রাজমাতার পদে থেকে যেমন অন্তর্কলহ দমন করেছিলেন, তেমনই মোগল সম্রাট আকবরের সেনাকে পর্যুদস্ত করেছিলেন।
এই রানীরা যে বাহিনীকে সবথেকে ভরসার চোখে দেখতেন, তারা ছিল আফ্রিকার ‘হাবসি’ (দাস) সেনাদল। সেই সেনাদলের অংশ হয়েই আফ্রিকা থেকে আসা একজন দাস এক সময় হয়ে ওঠে দক্ষিণের রাজনীতির অন্যতম ধুরন্ধর এক ব্যক্তিত্ব। আহমেদনগরের সিংহাসনে নিজামের অধিষ্ঠান থেকে জীবন-মৃত্যু সব কিছুই তার অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হতে থাকে। একই সঙ্গে প্রায় সিকি শতাব্দী সে মোগলদের দক্ষিণে বারে বারে বিধস্ত করেছিলেন। স্বয়ং জাহাঙ্গীর তাঁর জীবনী ‘তুজুকি-ই-জাহাঙ্গীরি’ -তে এই দাসের সম্পর্কে লিখছেন, ‘যুদ্ধনীতি, নেতৃত্ব, বিচার পদ্ধতি ও রাজকার্য কোনো কিছুতেই তাঁহার সমকক্ষ বা প্রতিপক্ষ কেহই ছিল না।’একটা লম্বা সময় অবধি অসংগঠিত মারাঠা জাতি ভিন্ন-ভিন্ন রাজ্যের অধীনে পয়সার বিনিময়ে যুদ্ধ করত। এই হাবসি দাস মারাঠা বাহিনীর ক্ষমতাকে চিহ্নিত করে আহমেদনগরের সেনাদলে মারাঠা অশ্বারোহীদের বৃহৎ সেনাদল গঠন করেন। সেই সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, শিবাজীর পিতামহ মালোজী মহারাজ। এই হাবসি দাসের মৃত্যুর পরে তার কাজ্জাকি বা গেরিলা যুদ্ধনীতিকে অনুসরণ করেই শিবাজীর পিতা শাহাজী মহারাজ ধীরে ধীরে মারাঠা সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। অদ্ভুত এই আফ্রিকান দাসের জীবনকথা যা অপঠিতই রয়ে গিয়েছে সিংহভাগ ভারতীয়ের কাছে। অথচ এই আফ্রিকান দাসই নিঃশব্দে ভারতের নিয়তি পালটে দিয়েছেন। কে জানত পৃথিবীর অন্ধকার মহাদেশের অন্ধকারতম প্রান্তে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে জন্ম গ্রহণ করা এই কৃষ্ণকায় শিশুটিই একদিন হাজার হাজার মাইল দূরে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে? কে জানত এই শিশুটিই মোগলদের সৈন্য রুখে দেবে? আর কে-ই বা সেদিন জানত এই শিশুর ছত্রছায়াতেই একদিন গড়ে উঠবে মোঘলদের সর্বপেক্ষা শক্তিশালী ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী?





Reviews
There are no reviews yet.