Description
রাজা যায় রাজা আসে
ভোরবেলা পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে পা নাচাচ্ছিল রাজেক। পরনে সবুজ জমির ওপর হলুদ হলুদ রেখ-কাটা লুঙ্গি আর জালি গেঞ্জি। এই সাত সকালেই চুলে কাঁকই পড়েছে, মাথায় পেখম তুলে টেরি কেটে নিয়েছে সে। তার বুকে এখন সুখের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আজই শুধু? ক’মাস ধরেই সুখের নদীতে বান ডেকে আছে তার।
পুবের ঘর বাদ দিলে উত্তর এবং পশ্চিমের ভিটেয় বড় বড় পঁচিশের বন্দের চার খানা ঘর। সেগুলোর মাথায় ঢেউটিনের নকশাকরা চাল, শালকাঠের খিলান-দেওয়া দেওয়াল, বিলিতি মাটির পাকা মেঝে।
রাজেক যেখানে বসে আছে, তার তলা থেকে ঢালা উঠোন। উঠোনটার একধারে সারি সারি ধানের ডোল, আরেক ধারে শিউলি গাছ। উঠোনের পর খানিকটা নাবাল জমি, পিঠক্ষিরা আর সোনালের ঝোপে জায়গাটা ছেয়ে আছে। তারপর পুকুর। পুকুর পেরিয়ে ধানের খেত। বর্ষায় পুকুর এবং ধানখেত ভেসে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এখনও তেমনিই রয়েছে, দুইয়ের মাঝখানে সীমারেখা নেই কোথাও ।
এতগুলো বড় বড় টিনের ঘর, প্রকাণ্ড উঠোন, পুকুর, পুকুরের পর একলপ্তে নব্বুই কানি দো-ফসলা জমি—সমস্ত মিলিয়ে রাজা-বাদশার ঐশ্বর্য। আর এ সবই এখন রাজেকের। অথচ আট মাস আগে? আট মাস আগের কথা এখন নয়।
আশ্বিন মাস যায় যায়। সারা বর্ষার জলে ধুয়ে ভাদ্রের গোড়ায় আকাশ সেই যে আশ্চর্য রকমের নীল হয়ে গিয়েছিল এখনও তা-ই আছে। তার গায়ে থোকা থোকা ভবঘুরে নেঘ। উঠোনের শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে সেজে রয়েছে। সেই কবে থেকে, শরৎ আসার আগেই বুঝি, সারা গায়ে ফুল ফোটাতে শুরু করেছিল গাছটা। এখনও ফুটিয়েই যাচ্ছে।
দেখতে দেখতে সূর্য উঠে গেল। গলানো সোনার মতো রোদের ঢল নামল চারিদিকে। কোত্থেকে দুটো মোহনচূড়া পাখি উত্তরের ঘরের চালে উড়ে এসে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে খুনসুটি জুড়ে দিল। সামনে-পেছনে, পুবে-পশ্চিমে—যেদিকেই চোখ ফেরানো যায়, শরৎকাল যেন যাদুকরের বেশে দাঁড়িয়ে।
পা নাচাতে নাচাতে অন্যমনস্কর মতো ধানখেতের দিকে তাকিয়ে ছিল রাজেক । ক’মাস ধরে রোজ সকালবেলা এমনিভাবে পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে অলস চোখে তাকিয়ে থাকছে সে। এটা যেন বিলাসের মতো, কিংবা তার মনেরই কোনও প্রিয় খেলা ।









Reviews
There are no reviews yet.